
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৬টি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য দল ৪টি, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি (ক্লোজড কনটেস্ট) হতে পারে। অন্যদিকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে সমর্থন করেছেন সর্বাধিক ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা। শফিকুর রহমানের পক্ষে মত দিয়েছেন ১৪ শতাংশ এবং নাহিদ ইসলামের পক্ষে মত দিয়েছেন ২ শতাংশ উত্তরদাতা। এ ছাড়া ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে মত প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক বলে জানিয়েছেন।
গতকাল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত এক ফলোআপ জনমত জরিপে এসব তথ্য জানানো হয়। এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)-এর উদ্যোগে সারা দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে মোট ৪১ হাজার ৫০০ জনের মতামত নিয়ে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির উপদেষ্টা ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেননূর। জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ইএএসডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. শামীম হায়দার তালুকদার। এ ছাড়া প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেন, গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর শামসুল আলম সেলিম, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক তৌফিক জোয়ার্দার, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সোহাগ আওয়াল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ প্রফেসর ড. নাহরীন আই খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ। জনমত জরিপের পদ্ধতি ও ফলাফলে জানানো হয়, আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন ফুটে উঠেছে এই জনমত জরিপে। জরিপটি দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনেই প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে। মোট ৪১,৫০০ জন উত্তরদাতার তথ্য ‘কোবো টুলবক্স’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। ১৮ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন।
এতে বলা হয়, রাজনৈতিক পছন্দের ক্ষেত্রে জরিপের সামগ্রিক ফলাফলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ ভোটারের পছন্দ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সর্বোচ্চ ৬৬.৩ ভাগ ভোটার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এর বিপরীতে ১১.৯ ভাগ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ১.৭ ভাগ ও অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির জনসমর্থন ৪ ভাগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২.৬ ভাগ। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেশি, যেখানে ৭১.১ ভাগ নারী ভোটার বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছেন। আঞ্চলিক বিশ্লেষণে বিএনপি জোটের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন পাওয়া গেছে যথাক্রমে চট্টগ্রামে ৭৬.৮ ভাগ এবং সিলেটে ৭৫.৬ ভাগ। তবে বরিশাল ও খুলনায় জামায়াতে ইসলামী জোটের শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে দলটির সমর্থন যথাক্রমে ১৭.৮ ভাগ এবং ১৮.৬ ভাগ। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রংপুরে জাতীয় পার্টি ৩ ভাগ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা বর্তমানে অত্যন্ত সুদৃঢ়। জরিপে অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ ৬৬.৪ ভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন যে আসন্ন নির্বাচনের পর বিএনপি জোট সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে এবং ৬৬.৩ ভাগ ভোটার তাদের নিজ নিজ আসনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সামগ্রিকভাবে এই জরিপটি দেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং একটি বৃহৎ পরিবর্তনের জন্য বিএনপির প্রতি প্রত্যাশাকেই জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। জরিপের তথ্য দিয়ে জানানো হয়, আগে নির্বাচনে আওয়ামী লীগে ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। এদের মধ্যে ৮০ ভাগ আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের ১৫ ভাগ জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং বাকি ৫ ভাগ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানের প্যানেল বক্তারা এই জনমতকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তারা বলেন, জনমতে নারী ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক দিক। জনগণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করছে, যেখানে নীতিনির্ধারণে জনস্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এই জনমত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ।



