বাণিজ্যসর্বশেষ

ব্যাংকঋণ এখন শিল্পের বোঝা

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগে গতি কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ বা কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছে। অর্থনীতির এ ধীরগতি এখন ধীরে ধীরে ব্যাংকিং কার্যক্রম, আমদানি এবং কর্মসংস্থান বাজারেও প্রভাব ফেলছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি কার্যক্রমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, কয়েক মাস ধরে আমদানি কমে যাওয়ায় গত ডিসেম্বরে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কম। ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদের সীমা প্রত্যাহারের পর ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান (স্পিড) দ্রুত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলসি কার্যক্রমেও এ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

গত নভেম্বরে ব্যাংকগুলোতে গড় আমানতের সুদের হার ছিল ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে গড় ঋণের সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশে। ফলে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। কয়েকটি ব্যাংকে এ ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি। এক বছর আগে একই সময়ে গড় স্পিড ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সুদের এই বড় ব্যবধানের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণ কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, টানা ৬ মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে। ২০২৫-এর নভেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলেছে, ব্যাংক ঋণ এখন শিল্প ও বিনিয়োগের সহায়ক শক্তি না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি বোঝায় পরিণত হয়েছে। উচ্চ সুদের হার, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতির কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ও সাশ্রয়ী ঋণ পাচ্ছেন না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের ব্যাংকনির্ভর বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকি নিতে অনীহার কারণে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণের বদলে স্বল্পমেয়াদি ও তুলনামূলক নিরাপদ খাতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার বাজারভিত্তিক হলেও ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতার অভাব এবং ঝুঁকি নিতে অনীহার কারণে ঋণের সুদ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে। অনেক ব্যাংক শিল্প ও ব্যবসায় ঋণ দেওয়ার বদলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক শাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত না হলে ব্যাংক ঋণ শিল্পের জন্য সহায়ক হয়ে উঠবে না।

উচ্চ সুদের প্রভাব আমদানিতেও দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবে একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তির হার কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানির ক্ষেত্রে তারা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় আমদানিও পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সুদের ব্যবধান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্বেগ জানিয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button