রাজনীতিসর্বশেষ

রক্তের টানে রাজপথে: জুলাই যোদ্ধা মামুন আহমদ

আব্দুর রহিম, সিলেট প্রতিনিধি :
​আহত জুলাই যোদ্ধা মামুন আহমদ বলেন তিনি সিলেটের রাজার গাঁও মাখজানুল উলুম দারুল হাদীস মাদ্রাসার ফযিলত দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। তখন সারা বাংলার আকাশ-বাতাস একটি স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ তখন কেবল একটি স্লোগান ছিল না, এটি রূপ নিচ্ছিল এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। আন্দোলনের শুরুতে আমার মধ্যে কিছুটা দোদুল্যমানতা কাজ করছিল, কিন্তু ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাইদ ভাইয়ের বুক পেতে দেওয়া সেই শাহাদাত আমার ভেতরের মানুষটাকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়।
​আবু সাইদ ভাইয়ের সেই রক্তভেজা শার্টের স্মৃতি আমাকে আর ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। ১৭ জুলাই থেকে তিনি আর মাদ্রাসায় স্থির থাকতে পারেননি; সিলেটের রাজপথে লড়াকু ছাত্রদের সারিতে নেমে এসেছিলেন। তিনি নিজে যেমন মাঠে গিয়েছিলেন, তেমনি মাদ্রাসার অন্য ভাইদেরও উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছেন বলেও জানান। তখন তার মনে একটি কথাই গেথে গিয়েছিল এ লড়াই তো ন্যায়ের লড়াই, এ লড়াইয়ে ঘরে থাকা পাপ!’
​৩ রা আগস্ট ফেসবুকের পাতায় ভেসে ওঠে এক অমোঘ ডাক—৪ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে ‘অসহযোগ আন্দোলন’। সে রাতে মামুন আহমেদ সহ ফযিলত ও দাওরায়ে হাদীসের ছাত্ররা শিক্ষকমণ্ডলীর সাথে জরুরি আলোচনায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয়, কাল সবাই মাঠে নামবেন। ৪ ঠা আগস্ট সকালে মুতাওয়াসসিতাহ ১ম বর্ষ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীসের (মাস্টার্স) সব ছাত্র সিলেটের রাজপথে বুক টান করে দাঁড়ায়।
​দুপুর ৩টার দিকে মাদ্রাসার ছাত্ররা ফিরে গেলেও, মামুনের মন মানছিল না। আছরের নামাজ শেষ করে প্রিয় সহপাঠী মুহসিন আহমেদকে সাথে নিয়ে মামুন আবার সিলেট নয়াসড়ক পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়ান।
​বিকেলের আলো তখন ফুরিয়ে আসছিল। হঠাৎ খবর এলো, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা মামুনদের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে। প্রথমে অল্প কিছু সন্ত্রাসী এসে চড়াও হয়। মামুরাও দমে যাওয়ার পাত্র ছিলো না। ইট-পাথর দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই সন্ত্রাসীরি পিছিয়ে যায়। কিন্তু এই স্বস্তি ছিল ক্ষণিকের জন্য । একটু পরই তারা বিশাল দলবল, লাঠি, ধারালো রামদা আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চারপাশ থেকে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকে শুধু গুলির আওয়াজ, আর আর্তনাদ। ছাত্র-জনতা দিকবিদিক হারিয়ে ছুটতে লাগল।
​বাধ্য হয়ে মামুনরা কয়েকজন নয়াসড়ক পয়েন্টের পাশের মসজিদের দোতলায় আশ্রয় নেয়। সেখানে মসজিদের নির্মাণকাজের কিছু ইট ছিল। সেই ইট দিয়েই ওপর থেকে তারা শেষ চেষ্টা করছিলো । কিন্তু হায়েনারা মসজিদের পবিত্রতা ভেঙে দোতলায় উঠে যায়। শুরু হয় লাঠি আর রামদার নৃশংস কোপ। আত্মরক্ষার্থে মামুন নিচে দৌড়ে নেমে আসার চেষ্টা করতেই ওরা মামুনকে ঘিরে ধরে। লাঠির নির্মম আঘাত আর রামদার ধারালো কোপ আছড়ে পড়ে মামুনের শরীরে, মাথায়। তীব্র যন্ত্রণায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম, আর ওঠার শক্তি ছিল না।
​সন্ত্রাসীরা তাকে টেনেহিছড়ে পাশের একটি বাসায় নিয়ে ফেলে রাখে। মামুন সেখানে আরেকজন রক্তাক্ত ভাইকে দেখতে পায়। আশ্রয়িত বাসার লোকজন দয়া করে কোনোমতে মামুন ও তার পাশে আহত থাকা লোকের পরিবারকে ফোন দিলেন। মামুনের বাড়ি দূরে হওয়ায় পরিবারের লোকজন অনুরোধ করলেন যেন আমাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর দুটো রিকশায় করে তাদের সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু খুনিদের নিষ্ঠুরতা সেখানেও থামেনি; হাসপাতালের পথে রিকশার ভেতরেও তাদের ওপর আবারও হামলা চালানো হয়। কোনমতে
​উইমেন্স মেডিকেলে পৌঁছানোর পর মামুনের মা-বাবা সেখানে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে হাসপাতালের বাইরেও সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব শুরু করেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সিকিউরিটি গার্ডরা মেইন গেইটে তালা মেরে সবাইকে ওপরের তলায় চলে যেতে বললেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আমার পরিবার মামুনকে নিয়ে ছুটলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
​কিন্তু মামুনরা জানতেন না ওসমানী মেডিকেলে গিয়ে নির্মমতার শিকার হতে হবে, । ঘণ্টার পর ঘণ্টা মামুন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রইল, কোনো ডাক্তার এগিয়ে এলেন না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাকে একটি রুমে নিয়ে কয়েকজন ডাক্তার চিকিৎসা করার বদলে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন। তারা বললেন:
​”কিসের জন্য আন্দোলনে গিয়েছিলে? আমরা আওয়ামী লীগ করি। এখন তোমাদের চিকিৎসা কে দেবে? সরকার থেকে নিষেধ আছে তোমাদের চিকিৎসা না দেওয়ার!”
​এই অমানুষিক কথাগুলো বলতে বলতেই তারা মামুনের শরীর থেকে কোনো অ্যানেস্থেসিয়া (অবশ) ছাড়াই গুলি বের করতে লাগলেন। একটা জ্যান্ত বকরির শরীর থেকে চামড়া ছালটালে যেমন কষ্ট হয়, ঠিক তেমন নারকীয় যন্ত্রণা দিয়ে তারা মামুনের শরীর থেকে গুলি বের করলেন। এরপর পায়ে প্লাস্টার করে রাত তিনটায় একটা ওয়ার্ডে ফেলে রাখলেন। সকালে ডাক্তার এসে নিষ্ঠুরভাবে বললেন, “তোমার চিকিৎসা এখানে হবে না, তুমি বাড়ি যাও, এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবে।”
​৬ আগস্ট, দেশ তখন স্বৈরাচারমুক্ত। মা-বাবা তাকে আবারও সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজে ভর্তি করালেন। সেখানে বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। এরপর সাভার সিআরপি (CRP), মৌলভীবাজার সিআরপি ঘুরে বর্তমানে আমি সিলেট সিআরপিতে চিকিৎসা নেন। মাথায় রামদার সেই গভীর কোপের ক্ষত নিয়ে আজও মামুন লড়াই করে যাচ্ছে।
​আজ মামুন গর্বিত। গর্বের সাথে চিনি বলেন মামুন আর কেউ নন, তিনি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের একজন গেজেটেড ‘জুলাই যোদ্ধা’ মামুন আহমদ।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button