রাজনীতিসর্বশেষ

মা, আমি কাজে যাচ্ছি: এক লড়াকু সানি আহমদের গল্প


​আব্দুর রহিম, সিলেট জেলা প্রতিনিধি:
​প্রতিটি শহীদের পেছনেই থাকে একেকটি মহাকাব্যিক গল্প। থাকে স্বপ্নভঙ্গ, পরিবারের হাহাকার আর দেশপ্রেমের অদম্য স্পৃহা। তেমনি এক নাম শহীদ সানি আহমদ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যে তরুণ আমাদের উপহার দিয়েছেন একটি মুক্ত আকাশ, সেই সানি আহমদের অকাল প্রয়াণে আজ স্তব্ধ তার পরিবার, বিশেষ করে তার মায়ের আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। সংগ্রামী এক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
​২০০০ সালের ৩ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন সানি আহমদ। বাবা কয়ছর আহমদ একজন কোরআন অনুরাগী মানুষ। পরিবারের অভাব দূর করতে বাবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা ছিল সানির নিয়তি। নিজের কোনো বসতভিটা নেই, বাসা ভাড়া করে থাকতে হতো পরিবারটিকে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা যখন শ্বাসকষ্টজনিত জটিল অসুস্থতায় আক্রান্ত হলেন, সানি তখন আর পাঠ্যবইয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেননি। পরিবারের হাল ধরতে পড়াশোনা ছেড়ে তিনি বেছে নেন রাজমিস্ত্রীর সহকারীর কাজ।
​সানির স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ , বিদেশে গিয়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের দারিদ্র্য ঘুচাবেন, বোনদের বিয়ে দেবেন আর নিজের এক টুকরো ভিটেমাটি কিনবেন। সেই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যেই পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা লিখে রেখেছিলেন অন্য কিছু।
​মায়ের সাথে শেষ কথোপকথন
​ঘটনার দিন, ৪ আগস্ট ২০২৪। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সানি বেরিয়েছিলেন। মা নিজ হাতে ছেলেকে ভাত খাইয়ে দিতেন, সেদিনও চেয়েছিলেন তাই করতে। কিন্তু সেদিন মায়ের হাতের ভাত আর খাওয়া হয়নি তার। আন্দোলনের ডাক তাকে টেনে নিয়েছিল রাজপথে। মা জানতেন না তার ছেলে কোথায় যাচ্ছে। মাইকে যখন মিছিল আর গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল, আতঙ্কিত মা ফোন করেছিলেন সানিকে। সানি মিথ্যা বলেছিল, “মা, আমি কাজে আছি, মিছিলে যাব না।” মায়ের কানে তখন ভেসে আসছিল মিছিলের উত্তাল স্লোগান। সেটিই ছিল মায়ের সাথে ছেলের শেষ কথা। কিছুক্ষণ পরই খবর আসে, সানি আর নেই।স্মৃতির আয়নায় এক শহীদ।
​সানি আহমদের গেজেট নম্বর ৭ এবং মেডিক্যাল কেস আইডি ২৩। বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার শিলঘাট গ্রামে। মা রুবিয়া বেগমের চোখে আজ কেবল ছেলের মুখ ভাসে। যে সন্তান রোজ কাজে যাওয়ার সময় মায়ের হাত ধরে শান্ত্বনা দিয়ে যেত, সেই সানি আজ ইতিহাস।
​তার ত্যাগের কথা লিখতে গিয়ে কলম থমকে যায়। কবি ঠিকই বলেছিলেন:
“তোমরা দিয়েছো বুকের রক্ত, দিয়েছো তাজা প্রাণ,
তোমাদেরই ত্যাগে মুখরিত আজ মুক্ত এ আসমান।”
​সানিরা বুলেটের মুখে বুক পেতে দিয়ে শৃঙ্খল ভেঙেছেন। আজ দুই বছর পার হতে চললেও মায়ের সেই বুকভরা হাহাকার থামেনি। একটি ঘর, একমুঠো স্বপ্ন আর বোনদের নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা, সবই আজ সানির রক্তে রঞ্জিত।
​সানি আহমদ আজ কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়, তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই শহীদদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, তাদের স্বপ্নগুলোকে অন্তত স্বীকৃতি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। সানি আহমদের মতো যোদ্ধারা চলে যান, কিন্তু তাদের আদর্শ আর মায়ের সেই অশ্রুসজল স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button